সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী আর নেই, সিরাজগঞ্জে দাফন | প্রধানমন্ত্রীর শোক !

0 0
Read Time:14 Minute, 51 Second

দ্যা ডেইলি নিউজ / ID/20 06 2020/TDNB/000117

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত দেশের দেশবরেণ্য সাংবাদিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী লোহানী আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দু’বার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনকারী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী শনিবার (২০ জুন) সকালে ১০টার দিকে রাজধানীর মহাখালীতে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৫ বছর ১১ মাস ২৫ দিন।  তিনি এক ছেলে, দুই মেয়েসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

কামাল লোহানীর মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করে তার ছেলে সাগর লোহানী বলেন, বাবার ফুসফুস ও কিডনিতে সমস্যা অনেক দিন ধরে। গত ১৮ জুন তার করোনা পজেটিভ আসে।

এর আগে গত ১৮ জুন শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার কারণে গত ১৭ মে সকালে তাকে একই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল।

সাগর লোহানী জানান, করোনায় আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও ফুসফুস-কিডনির জটিলতার সঙ্গে হৃদরোগ-ডায়াবেটিসের সমস্যাতেও ভুগছিলেন কামাল লোহানী।

কামাল লোহানী হিসেবে পরিচিত হলেও, তার পুরো নাম  আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে তার জন্ম। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী।

কর্মজীবনে কামাল লোহানী দৈনিক মিল্লাত পত্রিকা দিয়ে সাংবাদিকতার শুরু করেন। এরপর আজাদ, সংবাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

বিশিষ্ট সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীকে সিরাজগঞ্জে দাফন করা হবে। কামাল লোহানীর ছেলে সাগর লোহানী জানান, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার বাবাকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। বাবাকে উল্লাপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে আমার মা দীপ্তি লোহানীর কবরে দাফন করা হবে।

প্রচার ও তথ্য বিভাগের সম্পাদক আরিফ নূর জানান, বেলা ২টায় সাংবাদিক কামাল লোহানীর মরদেহ উদীচী কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে উনার প্রতি সাংস্কৃতিক কর্মীরা শ্রদ্ধা জানান।

সাংবাদিক কামাল লোহানীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা/ফাইল ফটঅ/র‍য়টার’স
একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাংবাদিক, বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল লোহানীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, কামাল লোহানী বাঙালির ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। একজন আদর্শবান ও গুণী মানুষ হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধের আর্দশ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সংস্কৃতি বিকাশের আন্দোলনে পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা একজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার অসাধারণ যোদ্ধাকে হারালাম।

প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

 

ঢাকা, বাংলাদেশ গ্লোবাল: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষা সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানীর মৃত্যুতে গভীর শোক এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

স্পীকার কামাল লোহানীর রুহের মাগফেরাত কামনা এবং তাঁর শােক-সন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

এছাড়া কামাল লোহানীর মৃত্যুতে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ফজলে রাব্বী মিয়া এবং চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পথচলা

আবু নাইম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী – বাংলাদেশে কামাল লোহানী নামেই তিনি ছিলেন পরিচিত।

তিনি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ১৯৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ও পরে বায়ান্ন সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন । সে সময়েই ভাষা আন্দোলনে জড়িত হবার মধ্য দিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে।

পরে কয়েক দফা জেল খেটেছেন এবং একই সাথে কারাগারে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমেদের মতো নেতাদেরও সাথেও। এক পর্যায়ে জড়িত হন বামপন্থী ধারার রাজনীতিতে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন নীতি ও আদর্শে অবিচল থেকে সবসময় দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করেছেন তিনি।

“১৯৬০ সালে তাকে প্রথম যখন দেখি তখন আমি স্কুলের ছাত্র। কামাল লোহানী তখন ছিলেন নৃত্যশিল্পী। আমি একটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলাম সেখানে নাচের দল ছিলো তাতেও তাকে পেয়েছিলাম। তিনি একজন বিপ্লবী। সৈনিক হিসেবেই তাকে বিবেচনা করি। তিনি আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গনকে যেমন সমৃদ্ধ করে গেছেন তেমনি মানুষের মুক্তি ও শোষণমুক্ত সমাজের জন্য সব সংগ্রামেই তিনি একাত্ম ছিলেন”।

জীবনের শুরু থেকেই কামাল লোহানী ছিলেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ সক্রিয় । ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রনাথ বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলো।

১৯৬২ সালে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এরপর পাঁচ বছরের মাথায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি, যাতে সক্রিয় ছিলেন আলতাফ মাহমুদ সহ আরও অনেকে প্রথিতযশা শিল্পী।

আবার ষাটের দশকের শেষ দিকে যোগ দেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপে এবং সক্রিয় হন আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে। ওই সময় পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে শিল্পীদের সংগঠিত করার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালে যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ বেতারের পরিচালকের দায়িত্ব পান।

পঁচাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর আবারো সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িত হন কামাল লোহানী। পরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলছেন কামাল লোহানীর মতো ব্যক্তিরা ছিলেন বলেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন বেগবান হয়েছিলো।

“৬৭ সাল থেকে কামাল লোহানীকে চিনি। ৬১ সালে যখন রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী বন্ধ করার চেষ্টা হলো তখনো কামাল লোহানী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলো। ৬৭-৬৮ সালে পাকিস্তান যখন রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধের পায়তারা করছিলো তখনো তার একই ভূমিকা ছিলো। ছায়ানটের সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ক্রান্তির মতো বিপ্লবী সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধানতম ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। কামাল লোহানীকে আমরা সবসময় একজন বিপ্লবী সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করবো”।

তিনি বলছেন ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের জন্যও কামাল লোহানী তার ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন এবং এ ধরণের মানুষ ছিলো বলেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন কখনো পথ হারায়নি।

সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবন

আবার রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বাইরে কামাল লোহানীর দীর্ঘ পেশাগত জীবন ছিলো সাংবাদিকতায়। কাজ করেছেন দৈনিক মিল্লাত ও দৈনিক আজাদসহ অনেকগুলো সংবাদপত্রে। কাজের পাশাপাশি নেতৃত্ব দিয়েছে সাংবাদিকদের সংগঠনুগলোতেও।

অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মিস্টার লোহানী। সিনিয়র সাংবাদিক ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

“ব্যক্তিগত জীবনে সৎ একজন মানুষ। দেশপ্রেমের পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ। সাংবাদিকতা করেছেন কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনের শেষ ভাগে যখন কাজ করছিলেননা তখনো যখনি পরামর্শ চেয়েছি তখনি সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন । এমনকি নবম ওয়েজ বোর্ডের আন্দোলনে আমাদের অনশনেও যোগ দিয়েছিলেন।”

সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে একুশে পদক পান কামাল লোহানী।

ছায়ানট ছাড়াও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাথে কামাল লোহানীর সংশ্লিষ্টতা ছিলো দীর্ঘকালের।

ব্যক্তিজীবনে দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক কামাল লোহানীর স্ত্রী দীপ্তি লোহানী প্রয়াত হয়েছেন আগেই।

বাঙ্গালীর দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পথ ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের চার দশকে -রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম যে অসামান্য ভূমিকা রেখে গেছেন তা সবসময়ই নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *