মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পর্বের সাক্ষী শাহজাহান সিরাজ আর নেই

0 0
Read Time:8 Minute, 36 Second

দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে মঙ্গলবার ঢাকার এভার কেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপোলো) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটেছে।

একাত্তর সালে উত্তাল মার্চে ছাত্র সমাজের পক্ষে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখা থাকবে শাহজাহান সিরাজের।

রাজনীতির শেষজীবনে বাম আদর্শের বিপরীতে হেঁটে বিএনপিতে ঠাঁই নিলেও জাসদ নেতা হিসেবেই মানুষ চেনে তাকে।

শাহজাহান সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে চিকিৎসকরা তার মৃত্যু ঘোষণা করেন।”

শাহজাহান সিরাজের বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তিনি স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ, মেয়ে সারওয়াত সিরাজ ও ছেলে রাজীব সিরাজ, মেয়ে শুক্লা সিরাজকে রেখে গেছেন।

ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ আগে থেকে ছিল শাহজাহান সিরাজের। ২০১২ সালে ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপর কয়েক বছর পর ক্যান্সার ধরা পড়ে মস্তিষ্কেও।

তখন থেকে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় শাহজাহান সিরাজ অসুস্থতা নিয়ে ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি ঘটলে সোমবার বাসা থেকে পুনরায় এভার কেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।


মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শাহজাহান সিরাজের লাশ নেওয়া হয় তার গুলশানের বাড়িতে।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বুধবার সকালে টাঙ্গাইলে নেওয়া হবে মরদেহ। সেখানে এলেঙ্গায় একটি এবং কালিহাতীতে একটি জানাজা হবে।

এরপর কফিন ঢাকায় আনার পর এশার নামাজ শেষে গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদে জানাজা মেষে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে শাহজাহান সিরাজকে।

স্বাধীনতার পূর্বে ছাত্রলীগকে নেতৃত্ব দেওয়া শাহজাহান সিরাজ ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ছাত্র সমাজের পক্ষে পড়েছিলেন স্বাধীনতার ইশতেহার। তখন ছাত্রলীগের ‘চার খলিফা’র একজন ছিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ‘চার খলিফা’ (শাহজাহান সিরাজের পারিবারিক অ‌্যালবাম থেকে নেওয়া ছবি)

স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে জাসদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। এরপর জাসদের নানা ভাঙনের মধ্যে নিজে একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

গত শতকের ৯০ এর দশকে এসে বিএনপিতে যোগ দেন শাহজাহান সিরাজ। মৃত্যুর সময় দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি বন ও পরিবেশমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

শাহজাহান সিরাজের মৃত্যুতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক জানিয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সিরাজের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

গণফোরামের সভাপতি কামাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।

হাসপাতালে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী আ স ম রবের সঙ্গে শাহজাহান সিরাজ (পারিবারিক অ‌্যালবাম থেকে নেওয়া ছবি)

শাহজাহান সিরাজের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে, তার বাবার নাম আব্দুল গণি মিয়া ও মারহিমা বেগম।

ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় শাহজাহান সিরাজের। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইলের করটিয়া সাদত কলেজ ছাত্র সংসদের দুই বার ভিপি ছিলেন তিনি।

ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের পর উত্তাল সময়ে ছাত্রলীগের নেতৃপর্যায়ে চলে আসেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭০ সালে তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

তখন ছাত্র আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে ছাত্রলীগের যে চারজনকে ‘চার খলিফা’ বলা হত, তাদের একজন হলেন শাহজাহান সিরাজ।


চার খলিফা- (বাঁ থেকে) শাহজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন (শাহজাহান সিরাজের পারিবারিক অ‌্যালবাম থেকে নেওয়া ছবি)

অন্য তিনজন ছিলেন ডাকসুর তখনকার ভিপি আ স ম আবদুর রব, ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী এবং ডাকসুর তৎকালীন জিএস আবদুল কুদ্দুস মাখন (প্রয়াত)।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ‘ছাত্র আন্দোলনের নিউক্লিয়াস’র পক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়েছিল পল্টন ময়দানে। সেদিন পতাকা উড়িয়েছিলেন রব, আর ইশতেহার পড়েছিলেন শাহজাহান সিরাজ।

মুজিব বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন শাহজাহান সিরাজ।

স্বাধীনতার পর রব-সিরাজের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের ভাঙন থেকে জাসদ গঠিত হলে সেই দলের সহ সাধারণ সম্পাদক হন শাহজাহান সিরাজ। তখন তাকে কিছু দিন কারাগারেও থাকতে হয়েছিল।

স্ত্রীর সঙ্গে শাহজাহান সিরাজ (পারিবারিক অ‌্যালবাম থেকে নেওয়া ছবি)

রাবেয়া সিরাজও তখন মামলায় জড়িয়েছিলেন। রাবেয়া বিএনপির সহযোগী সংগঠন মহিলা দলের নেত্রী থেকে পরে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ তাঁতী বিষয়ক সম্পাদকও হয়েছিলেন।

সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে কিছু দিন কারাগারে থেকে মুক্তি পেলেও অসুস্থতার কারণে আর রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেননি শাহজাহান সিরাজ।

শাহজাহান সিরাজ জাসদ ও বিএনপি উভয় দল থেকেই টাঙ্গাইলের কালিহাতী থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

তিনি ১৯৭৯ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাসদ থেকে। এরপর ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালের সংসদেও জাসদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি।

১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %