মানুষের জীবন রক্ষা আর জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে “অর্থনৈতিক উত্তরণ” বাজেট এর প্রস্তাব ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার

0 0
Read Time:12 Minute, 16 Second

দ্যা ডেইলি নিউজ / ID/11 06 2020/TDNB/00073-01

রোনাভাইরাসের বিপর্যয় মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় জাতীয় সংসদে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন।

মানুষের জীবন রক্ষা আর জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ: ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’ শিরোনামে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, যেখানে ৬ শতাংশ ঘাটতির কথা বলা হয়েছে (চলতি বছরের তুলনায় যা ১ শতাংশ বেশি) ।

করোনাভাইরাস মোকাবিলার জন্য এবার স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়া খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল৷ উন্নত স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি৷ 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য মোট ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী৷ যা বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বা ১৩.৬ শতাংশ বেশি৷ এই বাজেটের বড় একটি অংশই অবশ্য খরচ হবে পরিচালন ব্যয়ে৷ যার পরিমান ১৬ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা৷ বাকিটা মূলত ব্যয় হবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে৷

অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় চারটি খাতকে এবার সর্বাধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷ তার শীর্ষে রয়েছে স্বাস্থ্য৷ তিনি বলেছেন, ‘‘স্বাস্থ্য খাতকে এবার সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে এবং করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এখাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণ ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷’’ তবে মোট বাজেটে শতকরা হিসেবে স্বাস্থ্য খাত বরাদ্দ পেয়েছে পাঁচ দশমিক দুই ভাগ৷ তার চেয়েও বেশি বরাদ্দ আছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি, সুদ পরিশোধ, স্থানীয় সরকার, পরিবহন ও যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা ও জনপ্রশাসনে৷

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আমরা ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি৷ কোভিড-১৯ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় বর্তমানে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে৷” নতুন বাজেটে জরুরি চাহিদা মেটাতে ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাবও করেছেন তিনি৷

দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘কোভিড ১৯ মোকাবেলার অভিজ্ঞতা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে৷ এর ফলশ্রুতিতেত স্বাস্থ্য খাতে আমাদের দীর্ঘদিনের অর্জনসমূহ টেকসই করা এবং ভবিষ্যতে মহামারি/মরণব্যাধির প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ ও বেকাবেলাসহ সামগ্রিকভাবে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে৷’’

তবে বরাদ্দ বাড়লেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার ব্যবহার কতটা করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে৷ গত বাজেটে ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা রবাদ্দ দেয়া হলেও পরবর্তীতে তা সংশোধন করে ২৩ হাজার ৬৯২ কোটি টাকায় কমিয়ে আনা হয়েছে৷ শেষ পর্যন্ত সেই বরাদ্দের পুরোটাও খরচ করতে পারছে না মন্ত্রণালয়৷

আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেটে সব মিলিয়ে মোট পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী৷ যা বিদায়ী বছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৩ ভাগ বেশি৷ এরমধ্যে পরিচালন ব্যয়েই চলে যাবে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা৷ বাকি ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে উন্নয়নে৷

করোনার কারণে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৫.২ শতাংশ হবে বলে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী৷ তবে নতুন অর্থবছরের জন্য ঠিকই উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তিনি ৷ ‘‘কোভিড পরবর্তী উত্তরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৮.২ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে৷ এসময়ে মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশ হবে মর্মে আশা করছি,’’ বলেন অর্থমন্ত্রী৷  

এই বাজেটে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে যেসব আমদানিকৃত চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রয়োজন, সেগুলোর দাম কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আরও যে সকল পণ্যের দাম বাড়ানো ও কমানো হতে পারে, সেগুলো হল:

দাম বাড়তে পারে:

  • বিড়ি, সিগারেট, জর্দা বা তামাকজাতীয় পণ্য।
  • আমদানি করা পেঁয়াজ, লবন, মধু, দুধ, দুগ্ধজাতীয় পণ্য, চকলেট।
  • আমদানি করা অ্যালকোহল।
  • অনলাইন কেনাকাটা।
  • ইন্টারনেটের খরচ।
  • মোবাইল ফোনের খরচ ও মোবাইল ফোনের সিম কার্ড।
  • আসবাবপত্র।
  • বিদেশি টেলিভিশন।
  • প্রসাধন সামগ্রী।
  • সিরামিকের সিঙ্ক, বেসিন।
  • কার ও জিপের নিবন্ধন ব্যয়।
  • সাইকেল ও বিদেশি মোটর সাইকেল।
  • চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়া।
  • শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চ সার্ভিস।
  • আলোকসজ্জা।
  • ড্রেজার।
  • লোহা, বাণিজ্যিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ, ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ।
  • ফার্নেস তেল।

দাম কমতে পারে

  • এলপিজি সিলিন্ডার।
  • স্বর্ণ।
  • স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়পার।
  • জুতা তৈরির কাঁচামাল।
  • সরিষার তেল।
  • চিনি।
  • আলু ও ভুট্টা থেকে স্থানীয়ভাবে তৈরি চিপস বা প্রক্রিয়াজাত খাবার।
  • করোনাভাইরাস টেস্ট কিট, মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই এবং আইসিইউ যন্ত্রপাতি।
  • ডিটারজেন্ট।
  • মৎস্য, পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের কাঁচামাল।
  • রেফ্রিজারেটর ও এয়ারকন্ডিশনারের কম্প্রেসার।
  • আমদানি করা কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ।
  • কাগজ।
  • প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং।
  • সৌর ব্যাটারি।
  • পলিস্টার, রেয়ন, কটন ও অন্যান্য সিনথেটিক সুতা এবং টেক্সটাইলের কাঁচামাল ।
  • বেইজ অয়েল, লুব্রিকেটিং অয়েল ও লিক্যুইড প্যারাফিন।

নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী, সার, বীজ, কীটনাশক জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, কাঁচা তুলোসহ আরও কয়েকটি শিল্পের কাঁচামালের দাম অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

এবারের বাজেটে ব্যক্তিগত করের হার কমানো হলেও ব্যাংক হিসাবের স্থিতির ওপর আবগারি শুল্কের হার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যাংক হিসেবে ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা জমা থাকলে আবগারি শুল্ক আগে যেখানে ২৫০০ টাকা দিতে হতো। সেখানে এখন সেটা বাড়িয়ে ৩০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যাংক হিসেবের স্থিতি এক কোটি টাকা ৫ কোটি টাকা হলে এই আবগারি শুল্ক ১২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যাংক হিসেবের স্থিতি ৫ কোটি টাকার বেশি হলে আবগারি শুল্কের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে ব্যাংক হিসাবের স্থিতি ১০ লাখের নীচে হলে আবগারি শুল্কের হার আগের মতোই থাকবে।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে ১৩.২% বেশি। টাকার অংকে এই পার্থক্য ৬৬ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা।

করোনাভাইরাসের বিপর্যয় মোকাবিলায় এবারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়।

কৃষি খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয় ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।

এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাবদ ৯৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে ।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে সেইসঙ্গে পল্লি উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকার উন্নয়নে আগের চাইতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।

করোনাভাইরাসের কারণে যে জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাদের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে অথবা যারা চাকরি হারিয়েছেন তাদের সবার সুরক্ষার বিষয়টি এবারের বাজেটে বিবেচনা করা হয়েছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের ঘাটতির চেয়ে ৩৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বেশি। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে এই ঘাটতি মেটানো হবে বলে বাজেট অধিবেশনে জানানো হয়।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %