বিদ্যুৎ খাতে কভিডের প্রভাব অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে – আইইইএফএ, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান

0 0
Read Time:13 Minute, 45 Second

দ্যা ডেইলি নিউজবাংলাদেশ / ID/18 05 2020/TDNB/0014

কভিড-১৯ পরিস্থিতি দেশের বিদ্যুৎ খাতে এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস (আইইইএফএ)।

চাহিদায় প্রবৃদ্ধি না থাকলেও নতুন নতুন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোয় দেশে এখন সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহূত থাকছে। আবার এর মধ্যে রয়েছে তেলের মতো উচ্চমূল্যের জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রও। ফলে এসব কেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে যেমন বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তেমনি চাহিদা না থাকায় উৎপাদন ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পরিশোধ করতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। 

প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর আগেই দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪৩ শতাংশ ব্যবহূত হচ্ছিল (২০১৮-১৯ অর্থবছর)। মহামারীর কারণে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা আরো কমে গেছে। এতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) একদিকে রাজস্ব আয় হারাচ্ছে, অন্যদিকে অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করছে। মহামারীর আগেই এসব কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের জন্য সরকার ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। লোকসান কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে। এরই মধ্যে কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে দীর্ঘমেয়াদি ওভারক্যাপাসিটির আবর্তে পড়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হবে দেশ। অর্থনীতিতে কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব আমলে নিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে, তাতে ২০৩০ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেশি থাকবে বলে মনে করছে আইইইএফএ।

যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ সচিব ড. সুলতান আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের ক্যাপাসিটি রেশিও অতটা বেশি না। ভারতে ১০০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ দেশটির যে বিদ্যুৎ চাহিদা, তারচেয়ে সক্ষমতা দ্বিগুণ বা আড়াই গুণ বেশি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেরও উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। দেশগুলো যে পর্যায়ে গিয়েছে, আমরাও সেই পথেই এগোচ্ছি। যেমন আমরা চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছি। ভারতে বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ ও উৎপাদনের পর প্রয়োজন হলে মূল্য পরিশোধ করে বিদ্যুৎ নেয়া হয়।

তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা বিবেচনায় আমাদের যে সক্ষমতা এখন তৈরি হয়ে আছে, তা যথেষ্ট ভালো। আমাদের বর্তমান সক্ষমতা যেটা তৈরি হয়ে আছে, এটা অনেকটা সাসটেইনেবল, আমরা নিরাপদ আছি বলে আমি মনে করি। যে চাহিদার সৃষ্টি হচ্ছে, তা পূরণ করতে পারছি আমরা অপটিমাল প্লান্ট অপারেশন দিয়ে। এটা আমাদের জন্য দরকার। আমরা জাইকার মাস্টারপ্ল্যানের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী এগোচ্ছি। আমাদের জ্বালানি সক্ষমতাও ধারাবাহিকভাবে উন্নত হচ্ছে।

আইইইএফএর গবেষণায় কভিড-১৯-এর প্রভাব উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিদ্যুতের চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে ধারণার চেয়েও অনেক কমে যাবে। কারণ মহামারীর প্রভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা দুটোই কমবে। আজ সোমবার গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

বিপিডিবির তথ্যমতে, বিদ্যুৎ খাতের সর্বমোট উৎপাদন সক্ষমতা ১৯ হাজার ৬৩০ মেগাওয়াট। তবে গতকাল সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে প্রকৃত সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল মাত্র ১০ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। মহামারীর প্রভাবে মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আর বিদ্যুতের চাহিদা কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। তুলনামূলক স্বল্পমূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সরে এসে আমদানীকৃত কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদি ওভারক্যাপাসিটিতে বাংলাদেশকে আটকে দেবে, যার ফলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে বাড়বে বিদ্যুতের দাম। ২০০৯-১০ থেকে গত ১১ বছরে খুচরা পর্যায়ে ১০ দফায় বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৯৮ শতাংশ। সর্বশেষ এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানো হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বৃহদাকার বিদুৎকেন্দ্র দিন দিন গলার কাঁটা হয়ে উঠছে। কারণ এসব দেশে বিদ্যুতের চাহিদা আশানুরূপ বাড়ছে না। যেমন মিসর সম্প্রতি ৬.৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে, এর পরিবর্তে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি পিএলএনকে প্রায় ৪২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (৫ বিলিয়ন ডলার) ভর্তুকি দিয়েছে দেশটির সরকার। দেশটিতে ২০১৯ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির একটি অতিরঞ্জিত ধারণা করা হয়। এ বিভ্রান্তিকর ধারণার ভিত্তিতে সেখানে প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এর ফলে বিদ্যুতের ওভারক্যাপাসিটি সৃষ্টি হয় এবং প্রতি বছর ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে ভর্তুকি ও বিদ্যুতের দাম।

পটুয়াখালীর পায়রায় চালু হওয়া কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশেও ইন্দোনেশিয়ান অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। গত ১৪ মে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। কেন্দ্রটির অর্ধেকের বেশি উৎপাদন ক্ষমতা অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে থাকায় বাউবোকে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ১৬০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এতে বিপিডিবি আরো আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওভারক্যাপাসিটি নিয়ে উদ্বেগের কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে। যেমন—সম্প্রতি ৬.৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে মিসর, যাতে চীনের বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা ছিল।

গবেষকদের মতে, মহামারীর প্রভাবে যেমন দেশের কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে ধীরগতি এসেছে, তেমনি এটি বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা নতুন করে ঢেলে সাজানোর সুযোগ করে দিয়েছে। ভর্তুকি কমিয়ে এনে বিদ্যুতের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে গেলে নতুন নীতিমালা প্রয়োজন, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল শক্তি হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তিকে বিবেচনায় আনতে হবে।

ক্যাপাসিটি এবং এর সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জের অংক বাড়তে থাকলে পিডিবির দেনা বাড়বে, যার ফলে সরকারকে হয় ভর্তুকি নাহয় বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, কভিড-১৯ দেশের অর্থনীতিতে যে প্রভাব ফেলছে, তাতে বিদ্যুতের চাহিদা ও রাজস্ব আয় দুটোই কমছে এবং এতে বিপিডিবি আরো বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

কভিড-১৯ পরিস্থিতির আগে থেকেই বিপিডিবি বড় ধরনের লোকসানে ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পিডিবিকে দেয়া সরকারের ভর্তুকি ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি এবং লোকসান সামলানো ও নগদ অর্থের ঘাটতি মেটানোর জন্য এ ভর্তুকি দিতে হয়েছে। মহামারী শুরুর আগে পিডিবির ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা (১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ভর্তুকি প্রয়োজন হবে বলে মনে হচ্ছিল। মহামারীর পর ভর্তুকির পরিমাণ আরো বড় হয়ে যাবে।

যদিও দেশের বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় প্রাথমিকভাবে ব্যয়বহুল ডিজেল ও ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানো হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে নির্ভর করা হয়েছে আমদানীকৃত কয়লা ও এলএনজির ওপর, যা তুলনামূলকভাবে সস্তা নিজস্ব গ্যাসের বদলে ব্যবহার করা হবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক খরচ বেড়ে যাবে, ফলে বাড়বে ভর্তুকির পরিমাণ অথবা বিদ্যুতের খুচরা দাম অথবা দুটোই। সরকারের আর্থিক খাতে চাপ পড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিদ্যুতের গ্রাহকরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুতের দাম কমছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদন শুরু করেছে, যাতে বিদ্যুতের দাম প্রতি মেগাওয়াট ৫ হাজার ৫২৫ টাকা (৬৫ ডলার)। আগে যা ধারণা করা হয়েছিল, এদেশে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের উপযোগী জমির পরিমাণ তার চেয়ে বেশি। এছাড়া ব্যয়বহুল, আমদানীকৃত কয়লা ও এলএনজি এবং বিপুল অংকের ভর্তুকি ও উচ্চ মূল্যের বিদ্যুতের পথ থেকে সরে আসতে গেলে জমির ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। বিশ্বজুড়ে নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর ফলে অর্থনৈতিক মন্দায় বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যাবে, আর বাংলাদেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র মহামারীর অনেক আগে থেকেই অলস বসে ছিল।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস বিদ্যুতের বাজার, এর নীতি ও ধরন প্রভৃতি নিয়ে গবেষণা করে। প্রধান বিশ্লেষক হিসেবে গবেষণাটি করেছেন সাইমন নিকোলাস। সহগবেষক হিসেবে ছিলেন সারা জেন আহমেদ।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %